স্টাফ রিপোর্টার:
মেট্রোরেলকে বাংলাদেশের উন্নয়ন, অগ্রযাত্রা ও অহংকারের মুকুটে আরেকটি পালক বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু করে বাংলাদেশ এবং বাঙালি জাতি সারা বিশ্বে মর্যাদা পেয়েছে। আজকে আরেকটি নতুন অহংকারের পালক জনগণের মাথার মুকুটে সংযোজন করলাম। এসময় মেট্রোরেল ব্যবহারে সবাইকে যত্নশীল হতে আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
আজ বুধবার দুপুরে মেট্রোরেল উদ্বোধন উপলক্ষে রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়িতে আয়োজিত সুধী সমাবেশে দেয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
দেশবাসীকে ধন্যবাদ জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে আওয়ামী লীগকে আপনাদের সেবা করার সুযোগ দিয়েছিলেন। সে জন্য সবাইকে আমি ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মেট্রোরেলের উদ্বোধনের সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তিগত দিক থেকে অন্তত ৪টি মাইল ফলক বাংলাদেশের জনগণকে স্পর্শ করল-মেট্রোরেল নিজেই একটি মাইল ফলক; এই প্রথম বাংলাদেশ বৈদ্যুতিক ট্রেনের যুগে প্রবেশ করল; মেট্রোরেল দূর নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতি পরিচালিত হবে এবং বাংলাদেশ দ্রুত গতিসম্পন্ন ট্রেনের যুগে পদার্পণ করল। আমরা নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষণা দিয়েছিলাম, ঢাকা যানজটমুক্ত করার জন্য আমরা বিভিন্ন পদক্ষেপ নেব এবং পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করবো। আমরা ৬টি মেট্রোরেল লাইন সমন্বয়ে কর্ম পরিকল্পনা নিয়েছি, যা ২০৩০ সালের মধ্যে সম্পন্ন হবে বলে আমি আশা করি।
আওয়ামী লীগ সরকারের নেয়া নানা উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন তিনি বলেন, আমি মনে করি, মেট্রোরেল সম্পূর্ণ চালু হলে আমাদের দেশের মানুষের কর্মক্ষমতা বাড়বে। যোগ্যতা, কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে আর আমাদের জিডিপিতে যথেষ্ট অবদান রাখবে, বলেন শেখ হাসিনা।
দেশবাসীকে অনুরোধ জানিয়ে তিনি আরও বলেন, মনে রাখতে হবে অনেক টাকা খরচ করে এই মেট্রোরেল করা হয়েছে। এটাকে সংরক্ষণ করা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, সব কিছু যারা ব্যবহার করবেন তাদের দায়িত্ব। এখানে অনেক আধুনিক প্রযুক্তি সম্পন্ন যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়েছে, ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করা হয়েছে, কাজেই সেসব জিনিস যেন কোনো মতে নষ্ট না হয়।
সকলে যত্নবান হবেন, খেয়াল রাখবেন কেউ যাতে আমাদের এই স্টেশনগুলোতে আবর্জনা-ময়লা ফেলতে না পারে।
তিনি বলেন, যে কোনো একটা কাজ করতে গেলে অবশ্যই সাহসের প্রয়োজন হয়। সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হয়। আওয়ামী লীগ সরকারে আসার পর থেকে প্রতিটি কাজের জন্য সুষ্ঠু পরিকল্পনা নিয়ে আমরা দেশকে উন্নত-সমৃদ্ধ করার জন্য আমাদের আশু করণীয় কী, পাশাপাশি স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে প্রতিটি কাজ সম্পন্ন করে যাচ্ছি। যে কারণে মাত্র ১৪ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর আগে বক্তব্য রাখেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, আজ অতি আনন্দের দিন, রাজধানীবাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণের দিন। মেট্রোরেল উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাফল্যে আরেকটি পালক যুক্ত হলো।
আজ বেলা ১১টার দিকে মেট্রোরেলের উদ্বোধনী ফলকের প্রতিরূপ (রেপ্লিকা) জনসম্মুখে উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ছোট বোন শেখ রেহানা। প্রতিরূপ উন্মোচনের পর মোনাজাত করা হয়।
সুধী সমাবেশের সূচি অনুযায়ী, প্রথমে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত করা হয়। স্বাগত বক্তব্য দেন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরী। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন বাংলাদেশে জাইকার প্রধান প্রতিনিধি ইচিগুচি তমোহিদে, বাংলাদেশ নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত ইওয়ামা কিমিনোরি।
দুপুর দেড়টার দিকে দিয়াবাড়ি স্টেশনে আসেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে একটি তেঁতুল গাছের চাড়া রোপণ করেন। এরপর মোনাজাতে অংশ নেন। দিয়াবাড়ির স্টেশনের কাউন্টার থেকে টিকিট কেটে প্রথম যাত্রী যাত্রী হিসেবে মেট্রোরেলে চড়েন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এসময় তার ছোটবোন শেখ রেহানা, মন্ত্রিসভার সদস্যবৃন্দ ও আমন্ত্রিত অতিথিরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দিয়াবাড়ি থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত যাতায়াত করেন। সাধারণ যাত্রীরা অবশ্য মেট্রোরেলে চড়তে পারবেন আগামীকাল বৃহস্পতিবার সকাল আটটা থেকে।
ঢাকায় মেট্রোরেল নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আজ উদ্বোধনের পর মেট্রোরেল চলাচল করবে সীমিতভাবে। আগামী ২৬শে মার্চ থেকে উত্তরা-আগারগাঁও পথে পুরোদমে যাত্রী নিয়ে চলাচল করবে মেট্রোরেল। উত্তরা আগারগাঁও পথের জন্য ৬ কোচবিশিষ্ট ১০টি ট্রেন প্রস্তুত করা হয়েছে।
প্রাথমিক পরিকল্পনা হলো প্রথম তিন মাস মেট্রোরেল মাঝের কোনো স্টেশনে থামবে না। ১০ মিনিট পর পর ট্রেন যাত্রা শুরু করবে। দিনে চলবে ৪ ঘণ্টা সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত। প্রতিটি ট্রেন সর্বোচ্চ ২০০ যাত্রী নিয়ে চলাচল করবে। সপ্তাহে এক দিন মঙ্গলবার ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকবে। অবশ্য টিকিট কাটা, ওঠানামা ও চলাচলে মানুষের অভ্যস্ততা তৈরি হলে ঘন ঘন ট্রেন চলবে, সব স্টেশনে থামবে এবং যাত্রীও বেশি নেওয়া হবে।
ডিএমটিসিএল কর্মকর্তারা বলছেন, অভ্যস্ততা তৈরির পর নির্ধারিত সময় কমিয়ে আনা হতে পারে। মেট্রোরেলের মূল পরিকল্পনায় প্রতি সাড়ে তিন মিনিট অন্তর ট্রেন চলার কথা। মাঝের স্টেশনে যাত্রাবিরতির সময় হবে ৩০ সেকেন্ড।

