সিলেটরবিবার , ২৯ মার্চ ২০২৬
  1. আইন-আদালত
  2. আন্তর্জাতিক
  3. উপ সম্পাদকীয়
  4. খেলা
  5. ছবি কথা বলে
  6. জাতীয়
  7. ধর্ম
  8. নির্বাচন
  9. প্রবাস
  10. বিচিত্র সংবাদ
  11. বিনোদন
  12. বিয়ানী বাজার সংবাদ
  13. ব্রেকিং নিউজ
  14. মতামত
  15. রাজনীতি

জগন্নাথপুরে শোকের মাতম

admin
মার্চ ২৯, ২০২৬ ১১:৫৩ অপরাহ্ণ
Link Copied!

স্টাফ রিপোর্টার:

কত স্বপ্ন, আর কত আশা বুকে নিয়ে পরিবারের স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে জীবনবাজি রেখে লিবিয়া থেকে দালালের মাধ্যমে সাগর পথে রাবারের নৌকায় গ্রীসের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছিলেন সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরের ৫ যুবক। কিন্তু স্বপ্নের ইউরোপের প্রবেশ আর হলনা। হতভাগ্য  ৫ যুবকের। লিবিয়া থেকে রাবারের বোটে করে গ্রিসে যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে তাদের মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

শনিবার নৌকাডুবির ঘটনার পর তাদের মৃত্যুর খবর পরিবারের লোকজন জানতে পারেন। সাগরে এমন করুণ মৃত্যুর ঘটনায় নিহতদের পরিবারে শোকের মাতম চলছে। ৫ যুবকের এ করুণ মৃত্যুতে শুধু পরিবারের লোকজন কিংবা স্বজনরাই নয়, পুরো জগন্নাথপুর উপজেলাবাসী শোকে মুহ্যমান।

মারা যাওয়া ব্যক্তিরা হলেন, উপজেলার চিলাউড়া-হলদিপুর ইউনিয়নের চিলাউড়া গ্রামের দুলন মিয়ার ছেলে নাঈম মিয়া (২৫), একই গ্রামের শামছুল হকের ছেলে ইজাজুল হক (২৩), রানীগঞ্জ ইউনিয়নের টিঁয়ারগাঁও গ্রামের আখলুছ মিয়ার ছেলে শায়েক আহমদ (২৫), ইছগাঁও গ্রামের বশির মিয়ার ছেলে আলী আহমদ (২২) ও পাইলগাঁও গ্রামের হাবিবুর রহমানের ছেলে আমিনুর রহমান (২৬)।রবিবার দুপুরে সরজমিনে চিলাউড়া গ্রামে নিহত নাঈম মিয়ার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তাঁর মা আকি বেগম ছেলের মৃত্যুতে হাউ-মাউ করে কাঁদছেন। তাঁর বুক ফাটা কান্নায় কাঁদছেন স্বজনরাও।

 

তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছিলেন, আমার ছেলেকে দালাল মেরে ফেলেছে, তোমরা আমার নাঈম রে এনে দাও।

নাঈমের বাবা দুলন মিয়া বলেন, জগন্নাথপুরের ইছগাঁও গ্রামের দালাল আজিজুল ইসলামের সঙ্গে গ্রিসে পাঠানোর জন্য ১৩ লাখ টাকার চুক্তিতে জানুয়ারি মাসে লিবিয়া যায় আমার ছেলে। সেখানে যাওয়ার কিছুদিন পর গ্রিসের গেম দেওয়ার কথা বলে আরও ৫ লাখ টাকা দাবী করে দালাল। তাঁর দাবীকৃত টাকা পরিশোধ করার পরও গ্রিসে পাঠাতে টালবাহানা করে। অবশেষে ২১ মার্চ গেম দেওয়া হয়। কথা ছিল গেম দেওয়ার আগে আমাদেরকে জানানো হবে। কিন্তু আমাদের জানানো হয়নি। শনিবার জানতে পারি সাগরে আমার ছেলে মারা গেছে এবং তার লাশ সাগরেই ফেলে দেওয়া হয়েছে। আমি সরকারের নিকট এই দালালের বিচার দাবী করছি।

 

একই গ্রামের ইজাজুল হক রেজার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পিনপতন নিরবতা। এলাকার লোকজন ভিড় করছেন বাড়িতে। স্বজন ও প্রতিবেশীরা ইজাজুল হকের পরিবারের লোকজনকে সান্তনা দিচ্ছেন।

 

ইজাজুল হকের বাবা সামছুল হক কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ছাতক উপজেলার শক্তিগাঁও গ্রামের দালাল দুলাল মিয়ার মাধ্যমে ১২ লাখ টাকার চুক্তিতে ৩ মাস আগে লিবিয়া গিয়েছে আমার ছেলে। সেখান থেকে গ্রিসে পাঠানোর কথা। সব টাকা পরিশোধ করা হলেও গ্রিসে পাঠাতে কালক্ষেপণ করতে থাকে ওই দালাল। আমার ছেলে ঈদের আগে ভয়েস বার্তায় জানায়, “দালাল আমাদের খাওয়া দাওয়া দিচ্ছে না। বড় কষ্টে আছি। দোয়া করিও”। এরপর আমার ছেলের সঙ্গে আর কথা হয়নি। আমরা দালালের সঙ্গে অনেক চেষ্টা করেও যোগাযোগ করতে পারিনি। এখন শুনি আমার ছেলে মারা গেছে।

 

প্রতিবেশী ফজলু মিয়া বলেন, দালাল ইউরোপের স্বপ্ন দেখিয়ে প্ররোচিত করে অনেক পরিবারের সর্বস্ব লুটে নিচ্ছে। তাদের কারণে অকালে ঝরছে তরতাজা প্রাণ। এদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

 

চিলাউড়া-হলদিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম বকুল বলেন, শনিবার রাতে খবর পেলাম আমার ইউনিয়নের একই গ্রামের দুই যুবক সাগরে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে মারা গেছে। তাদের মৃত্যুতে পুরো গ্রামের মানুষ শোকাহত।

তিনি বলেন, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাঠানোর কথা বলে প্রতারণার মাধ্যমে দালাল চক্র লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। তাদের ফাঁদে দেশের শত শত পরিবার নিঃস্ব হচ্ছে। অকালে প্রাণ হারাচ্ছে শত শত যুবক। দ্রুত সব দালাল চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবী জানাচ্ছি।

 

এদিকে, প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিবারের খোঁজ নিচ্ছেন জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরকত উল্লাহ।

 

এ সময় তিনি বলেন,  গ্রিস যাওয়ার পথে এ উপজেলার ৫ জন মৃত্যুবরণ করেছেন। বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে উর্ধতন কর্তৃপক্ষের নিকট পাঠানো হবে।

 

তিনি বলেন, এ ধরনের অন্ধকার পথে আর যেন কেউ পা না বাড়ায়। এ ব্যাপারে সবাইকে সচেতন হতে হবে।

 

উল্লেখ্য, ইউরোপের গ্রিস যাওয়ার জন্য দালাল চক্রের সঙ্গে প্রত্যেককে ১২ থেকে ১৪ লাখ টাকা করে চুক্তি করে গত ৩-৪ মাস পূর্বে লিবিয়ায় যান তারা। সেখান থেকে গত ২১ মার্চ রাবার বোটে গ্রিসের উদেশ্যে সাগরপথে যাত্রা করে অভিবাসীরা। এই যাত্রা ‘গেম’ হিসেবে পরিচিত। বোটে খাবার ও পানির সংকটের কারণে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে ১৮ জন মারা যান। তাঁদের মধ্যে জগন্নাথপুরের পাঁচজন।

 

পরে তাদের লাশ সাগরে ফেলে দেওয়া হয়েছে। ওই যাত্রা থেকে বেঁচে ফেরা ব্যক্তিরা শনিবার গ্রিসের কোস্টগার্ডকে এ তথ্য জানান।