স্টাফ রিপোর্টার:
সিলেটে ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরী কাঁদছে; এক যুবক তার কোমরে শক্ত করে বাঁধা শিকল ধরে তাকে রাস্তা দিয়ে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। ৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৭টার দিকে একটি দোকানের ক্যাশ বক্স থেকে টাকা চুরির চেষ্টার অভিযোগে স্থানীয়রা তাকে আটক করেছিল। কিন্তু তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার পরিবর্তে, গভীর রাতে তাকে মারধর করা হয় এবং রাস্তায় টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঘটনাটির ৩৬ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ৮ সেপ্টেম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এটি একটি কঠিন প্রশ্ন সামনে এনেছে: সাধারণ মানুষ যখন কাউকে অপরাধী সন্দেহে আটক করে, তখন তারা আইনত কতদূর পর্যন্ত যেতে পারে?
এর উত্তরটি সহজ: খুব বেশি দূর নয়। একজন সাধারণ মানুষ কি কোনো সন্দেহভাজন অপরাধীকে গ্রেপ্তার করতে পারেন? নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে, হ্যাঁ, পারেন।
ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৯ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি দেখেন যে কেউ জামিন-অযোগ্য ও আমলযোগ্য (cognisable) অপরাধ করছে কিংবা ঘোষিত অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত, তবে তিনি তাকে গ্রেপ্তার করতে পারেন।
তবে আটক ব্যক্তিকে কোনো অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব ছাড়াই পুলিশের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। যদি কোনো পুলিশ কর্মকর্তা তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া না যায়, তবে তাকে নিকটস্থ থানায় নিয়ে যেতে হবে অথবা নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সুদীপ্ত অর্জুন বলেন, এই বিধানটি সাধারণ মানুষকে কোনো সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে নিজেদের হেফাজতে আটকে রাখার ক্ষমতা দেয় না।
এর মানে কি এই যে, মানুষ ওই ব্যক্তিকে শাস্তি দিতে পারে?
সুদীপ্ত অর্জুন বলেন, ‘কাউকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া এবং অপরাধ করেছে বলে বিশ্বাস করে কাউকে শাস্তি দেওয়া—এই দুটির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আটক করা ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়া—যেমন কোমরে শিকল বেঁধে জনসমক্ষে হাঁটানো কিংবা শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করা—এ ধরনের আচরণ আইনের পরিপন্থী এবং দণ্ডনীয় অপরাধ।’ সুতরাং, প্রাথমিক আটকাদেশটি বৈধ হলেও, এরপর যা ঘটেছে তা বৈধ হয়ে যায় না। কেউ দোষী কি না এবং তার কী শাস্তি হওয়া উচিত—তা নির্ধারণ করা বিচার ব্যবস্থার কাজ।
সংবিধানে কী বলা হয়েছে?
অনুচ্ছেদ ৩১ আইনের আশ্রয়লাভের অধিকারের নিশ্চয়তা দেয়, অনুচ্ছেদ ৩২ জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সুরক্ষা নিশ্চিত করে এবং অনুচ্ছেদ ৩৫(৫)-এ নির্যাতন ও নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণ বা শাস্তি নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার ফারান মো. আরাফ বলেন, শারীরিক নির্যাতন, শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা এবং জনসমক্ষে অপদস্থ করার মতো ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে এই সুরক্ষা বিধানগুলো সরাসরি প্রাসঙ্গিক।
তিনি বলেন, আইন অনুযায়ী, দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত একজন ব্যক্তিকে নির্দোষ বলে গণ্য করা হয়। তাই, কোনো অপরাধের অভিযোগ থাকলেও, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী অভিযুক্তকে শাস্তি দিতে পারে না।
কাউকে আটকে রাখা কি নিজেই একটি অপরাধ হতে পারে?
পরিস্থিতিভেদে তা অপরাধ হতে পারে।
দণ্ডবিধির ৩৪২ ধারায় বেআইনিভাবে আটকে রাখাকে (wrongful confinement) অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে; এর শাস্তি হিসেবে সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড, ১,০০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে। ৩৪১ ধারায় আলাদাভাবে 'বেআইনিভাবে গতিরোধ' (wrongful restraint)-এর বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
সিলেটের ঘটনার ক্ষেত্রে এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। তদন্তকারীদের নিশ্চিত করতে হবে যে মেয়েটিকে আটকে রাখার পর কী ঘটেছিল, কারা এর সঙ্গে জড়িত ছিল এবং তাকে কতক্ষণ সেখানে আটকে রাখা হয়েছিল।
জনসমক্ষে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা ও টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি কেমন?
এটি কাউকে চলে যেতে বাধা দেওয়ার সাধারণ বিষয়টির চেয়েও গুরুতর।
ব্যারিস্টার ফারান বলেন, বেআইনিভাবে আটকে রাখা, শারীরিক আঘাত, শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা এবং জনসমক্ষে অপদস্থ করার মতো কাজগুলো দেশের আইনি সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানবাধিকারের মানদণ্ড—উভয়ই লঙ্ঘন করতে পারে।
তিনি বলেন, "তদন্ত, দোষ নির্ধারণ এবং শাস্তি প্রদানের বিষয়টি উপযুক্ত রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ ও আদালতের এখতিয়ারভুক্ত।"
মেয়েটির বয়স কেন গুরুত্বপূর্ণ?
মেয়েটির বয়স ১৬ বছর, অর্থাৎ সে নাবালক। এর অর্থ হলো, অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত শিশুদের সুরক্ষার আইনি কাঠামোর মধ্যেও এই ঘটনাটি পড়ে।
মূল নীতিটি একই থাকে: অভিযোগ মানেই দোষী সাব্যস্ত হওয়া নয় এবং কোনো অপরাধের অভিযোগ থাকলেই অভিযুক্তকে শাস্তি দেওয়ার অধিকার অন্যদের তৈরি হয় না।
এমন ঘটনা কি আগেও ঘটেছে?
কথিত বা অনুভূত কোনো অন্যায়ের জেরে অপ্রাপ্তবয়স্কদের ওপর প্রকাশ্যে সহিংসতার শিকার হওয়ার ঘটনাগুলোর মধ্যে সিলেটের ঘটনাটিই প্রথম নয়।
গত মে মাসে মুন্সিগঞ্জ লঞ্চ টার্মিনালে পোশাক নিয়ে ক্ষুব্ধ জনতার রোষানলে পড়ে দুই কিশোরী লঞ্চের ওপর বেল্টের আঘাতে লাঞ্ছিত হয়েছিল। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, এক যুবক ওই কিশোরীদের মারধর করছে এবং বহু মানুষ সেই দৃশ্য ধারণ করার পাশাপাশি উল্লাস করছে।
নিহাল আহমেদ জিহাদ নামের ওই যুবক দাবি করেছিল যে, বড় ভাই হিসেবে ‘শাসন’ করার জন্যই সে তাদের মারধর করেছিল এবং সে আরও বড় ধরনের হামলা ঠেকানোর চেষ্টা করছিল।
সিলেটের ঘটনার প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও উভয় ঘটনাই একই প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে: অন্য কোনো ব্যক্তি শাস্তির যোগ্য কি না—তা নির্ধারণ করার অধিকার কার?
আইন হয়তো সীমিত কিছু পরিস্থিতিতে কোনো সাধারণ নাগরিককে কাউকে আটক করার অনুমতি দেয়; কিন্তু তা কাউকে শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা দেয় না।
সিলেটের ঘটনায় চুরির অভিযোগটি পুরো ঘটনার কেবল একটি অংশ মাত্র।
নুসরাত তৈয়বা মিম: শিক্ষার্থী, আইন ও মানবাধিকার বিভাগ, এশিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটি
সম্পাদক ও প্রকাশক: আব্দুল খালিক
আইন-উপদেষ্টা: ব্যারিস্টার ফয়সাল দস্তগীর, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।
প্রকাশক কর্তৃক উত্তরা অফসেট প্রিন্টার্স কলেজ রোড, বিয়ানীবাজার, সিলেট থেকে মুদ্রিত ও শরীফা বিবি হাউজ, মেওয়া থেকে প্রকাশিত।
বানিজ্যিক কার্যালয় :
উত্তর বাজার মেইন রোড, বিয়ানীবাজার, সিলেট।
মোবাইল: ০১৮১৯-৫৬৪৮৮১, ০১৮৩১-১৬৯৯৮৫
ই-মেইল: thedailysylhetkantha@gmail.com