নিজস্ব প্রতিবেদক :
সিলেটে পুলিশ হেফাজতে রায়হান আহমদের মৃত্যুর ঘটনায় করা মামলার রায় হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) প্রধান আসামি সাবেক এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়ার মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। রায়হান হত্যা মামালায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পেয়েছেন দুই পুলিশ সদস্য। আরও তিন আসামিকে দেওয়া হয়েছে সাত বছর করে কারাদণ্ড। কিন্তু দণ্ডিতদের পাঁচজনই পলাতক। তাঁদের মধ্যে পুলিশের চার সদস্য। রায় ঘোষণার পরও তাদের অবস্থান নিয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য নেই। তারা দেশে আত্মগোপনে, নাকি বিদেশে চলে গেছেন—এ প্রশ্ন এখন সিলেটজুড়ে।
২০২০ সালের ১০ অক্টোবর রাতে সিলেট মহানগর পুলিশের বন্দরবাজার ফাঁড়িতে তুলে নিয়ে রায়হান আহমদকে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। পরদিন ১১ অক্টোবর তাঁর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় রায়হানের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে মামলা করেন।
প্রাথমিক অনুসন্ধানেও ফাঁড়িতে নির্যাতনের তথ্য উঠে আসে। ঘটনার পর তৎকালীন ফাঁড়ি ইনচার্জ এসআই আকবরসহ চার পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। আরও কয়েকজনকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়।
ঘটনার পর ১৩ অক্টোবর পুলিশি হেফাজত থেকে পালিয়ে যান আকবর। তাঁকে ধরতে অভিযান শুরু হয়। প্রায় এক মাস পর, ২০২০ সালের ৯ নভেম্বর কানাইঘাটের দোনা সীমান্ত এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তারের কথা জানায় পুলিশ। গ্রেপ্তারের পর তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। পরে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) মামলার তদন্ত করে।
২০২১ সালের ৫ মে ছয়জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয় সংস্থাটি। একই বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর বিচার শুরু হয়।
জামিনের পর আত্মগোপনে আকবর-
আদালত সূত্র জানায়, উচ্চ আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পর ২০২৫ সালের আগস্টে সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান আকবর। পরে তাঁর জামিন স্থগিত করা হয়। তাঁকে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশও দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি আর আদালতে হাজির হননি। এরপর থেকে তাঁর হদিস নেই। রায়হানের পরিবারের অভিযোগ, জামিনে মুক্ত হয়েই আকবর ভারতে পালিয়ে গেছেন। তবে তাঁর বর্তমান অবস্থান স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
আকবরের পাশাপাশি পলাতক রয়েছেন সাবেক কনস্টেবল হারুন অর রশিদ, টিটু চন্দ্র দাস ও সাবেক এসআই মো. হাসান উদ্দিন। মামলার আরেক আসামি সংবাদকর্মী আবদুল্লাহ আল নোমানও পলাতক। তাঁদের কেউ দেশে আছেন, নাকি বিদেশে চলে গেছেন—তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত অন্য ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হলেও রায়হান হত্যা মামলার দণ্ডিত আসামিরা কেন ধরাছোঁয়ার বাইরে, সেই প্রশ্নও তুলছেন সিলেটের বাসিন্দারা।সিলেট জেলা
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক আব্দুল মজিদ মুন্সী ১৫৭ পৃষ্ঠার রায়ে আকবরকে মৃত্যুদণ্ড দেন। একই সঙ্গে তাঁকে এক লাখ টাকা জরিমানা এবং দণ্ডবিধির ২০১ ধারায় সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। সাবেক কনস্টেবল হারুন অর রশিদ ও টিটু চন্দ্র দাসকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। সাবেক এএসআই আশেক এলাহী, সাবেক এসআই হাসান উদ্দিন ও আবদুল্লাহ আল নোমানকে দণ্ডবিধির ২০১ ধারায় সাত বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
রায় ঘোষণার দিন কড়া নিরাপত্তায় আদালতে হাজির করা হয় একমাত্র কারাবন্দি আসামি আশেক এলাহীকে। বাকি পাঁচজন ছিলেন পলাতক।
রায়হানের পরিবারের প্রশ্ন, বড় বড় মামলার আসামিরা গ্রেপ্তার হলে এই মামলার দণ্ডিতদের কেন গ্রেপ্তার করা যাচ্ছে না? ছয় বছর ধরে বিচার পাওয়ার অপেক্ষার পর রায় এসেছে। কিন্তু আসামিরা গ্রেপ্তার না হলে সেই রায়ের বাস্তবায়ন কীভাবে হবে? এখন পরিবারের দাবি, পলাতকদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আদালতের সাজা কার্যকর করা হোক।

