নিউজ ডেস্ক:
নিজের প্রেমিকার সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার সন্দেহে বশে সিলেটে ব্যবসায়ী শাহাব উদ্দিনকে হত্যা করা করেন জালাল উদ্দিন। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার জালাল উদ্দিনের জবানবন্দির বরাত দিয়ে এমনটি জানিয়েছেন সিলেট মহানগর পুলিশ (এসএমপি) কমিশনার সারোয়ার মোর্শেদ শামীম।
বৃহস্পতিবার দুপুরে নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এমনটি জানান তিনি।
কমিশনার বলেন, ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, গ্রেপ্তার হওয়া জালালের সঙ্গে রেহানা পারভীন নামের এক নারীর প্রেমঘটিত সম্পর্ক ছিল, যা বিয়ে পর্যন্ত গড়ানোর কথা ছিল। তবে গত প্রায় তিন মাস ধরে বিয়ে নিয়ে দুজনের মধ্যে টানাপোড়েন চলছিল। এই দীর্ঘ অনিশ্চয়তার মধ্যে জালালের সন্দেহ হয়, রেহানা তার কাছ থেকে সরে যাচ্ছেন। শাহাব উদ্দিনের সঙ্গে রেহানার নিয়মিত কথাবার্তা ও হাসিঠাট্টা হতো জেনে জালাল সন্দেহ করেন, সম্পর্কটি সেদিকেই মোড় নিচ্ছে কি না। এই সন্দেহ থেকেই তিনি শাহাব উদ্দিনকে হত্যা করেন বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে বলে জানান কমিশনার।
তিনি আরও বলেন, ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য এবং প্রযুক্তিগত প্রমাণ পর্যালোচনা করেই এই সিদ্ধান্তে আসা হয়েছে, তবে বিষয়টি এখনো তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং এর বাইরে অন্য কোনো কারণ জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
গত রোববার দিবাগত রাতে নিজ বাসার কাছ থেকে গুরুতর আহত অবস্থায় শাহাব উদ্দিনকে উদ্ধার করেন স্বজনেরা। হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়। নিহতের ছোট ছেলে রেদোয়ান আহমদ জানান, স্থানীয় একজনের কাছ থেকে খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে বাবাকে রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখেন। তাঁর ঘাড়ে ধারালো অস্ত্রের তিনটি আঘাতের চিহ্ন ছিল।
নিহত শাহাব উদ্দিন বিয়ানীবাজার উপজেলার চারখাই এলাকার বাসিন্দা। তিনি পরিবার নিয়ে শাহপরাণ এলাকায় থাকতেন এবং চারখাই বাজারে তাঁর ভোগ্যপণ্যের ব্যবসা ছিল। তিনি দুই ছেলে ও দুই মেয়ের বাবা; এক ছেলে থাকেন ফ্রান্সে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, শাহাব উদ্দিনের সঙ্গে কারও বিরোধ ছিল বলে তাঁদের জানা নেই।
ঘটনার পরদিন মঙ্গলবার রাত আনুমানিক ৯টার দিকে শাহপরাণ মাজার এলাকা থেকে জালালকে (৩৫) গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
ময়নাতদন্ত শেষে গত বুধবার দুপুরে শাহাব উদ্দিনের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে পুলিশ। বাদ আসর জানাজা শেষে তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়।
পুলিশ কমিশনার জানান, ঘটনাস্থল থেকে কিছুদূর গিয়ে খুনি তার পরণের রেইনকোট ফেলে দেয়। আরও কিছুদূর যাওয়ার পর পায়ের স্যান্ডেল ও হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত রামদা ছুঁড়ে ফেলে। এই ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া রেইনকোট ও স্যান্ডেলই চিনিয়ে দেয় খুনিকে। পরে কৌশলে স্থানীয় জনতার সহায়তায় আটক করা হয় খুনিকে।
আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে গ্রেপ্তার হওয়া জালাল উদ্দিন জানিয়েছে, ব্যবসায়ী শাহাব উদ্দিনের সাথে তার প্রেমিকা সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছে এমন সন্দেহ থেকে সে হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়েছে।
জালালের জবানবন্দির বরাত দিয়ে এসএমপি কমিশনার জানান, জালাল যে রেস্টুরেন্টে কাজ করতো সেই সেখানে রেহানা পারভিন নামে আরেক কর্মচারী ছিলেন। প্রায় ৭ বছর আগে রেহানার স্বামী মারা যান। এরপর থেকে জালালের সাথে রেহানার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। মাঝে মধ্যে তাদের শারীরিক সম্পর্কও হতো। রেহানাকে বিয়ে করার কথা ছিল জালালের। রেহানা মাঝে মধ্যে রেস্টুরেন্টের পার্শ্ববর্তী শাহাব উদ্দিনের দোকানে যেত। এসময় শাহাব উদ্দিনের সাথে কথা বলতো। বিষয়টি ভালভাবে নেয়নি জালাল। গেল ৩/৪ মাস ধরে রেহানার সাথে তার মনমালিন্য হচ্ছিল। রেহানা বিয়েতে অসম্মতি জানাচ্ছিল। এতে শাহাব উদ্দিন ও রেহানার সম্পর্ক নিয়ে জালালের সন্দেহ আরও গাঢ় হয়। এনিয়ে শাহাব উদ্দিনের সাথে তার কয়েকবার কথাকাটাকাটি হয়। শাহাব উদ্দিন তাকে গালমন্দ করেন। এতে জালাল ক্ষুব্ধ হয়ে শাহাব উদ্দিনকে দেখে নেওয়ার পরিকল্পনা আঁটে।
এসএমপি কমিশনার সারোয়ার শামীম আরও জানান, ২৩ আগস্ট রাতে দোকান বন্ধ করে বাসায় ফেরার সময় শাহাব উদ্দিনের পিছু নেয় জালাল। বাসার কাছে নির্জন স্থানে আসার পর জালাল প্রায় ২৪ ইঞ্চি লম্বা দা বের করে প্রথমে শাহাব উদ্দিনের কানের উপরে মাথায় আঘাত করে। এতে তিনি পড়ে গেলে তার গলায় আরেকটি কোপ দেয়। শাহাব উদ্দিনকে রক্তাক্ত অবস্থায় ফেলে দিয়ে কিছু দূর গিয়ে সে প্রথমে তার পরণের রেইনকোট ফেলে দেয়। আরও কিছুদূর যাওয়ার পর পায়ের স্যান্ডেল ও দা ছুঁড়ে ফেলে দেয়। পরে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ, রেইনকোট ও স্যান্ডেল দেখে খুনি হিসেবে জালাল উদ্দিনকে সনাক্ত করা হয়।
কমিশনার জানান, স্থানীয় জনতার সহযোগিতায় কৌশলে জালালকে আটক করা হয়। পরে আদালতে সে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।

