সিলেটSunday , 21 August 2022
  1. আইন-আদালত
  2. আন্তর্জাতিক
  3. উপ সম্পাদকীয়
  4. খেলা
  5. ছবি কথা বলে
  6. জাতীয়
  7. ধর্ম
  8. প্রবাস
  9. বিচিত্র সংবাদ
  10. বিনোদন
  11. বিয়ানী বাজার সংবাদ
  12. ব্রেকিং নিউজ
  13. মতামত
  14. মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু
  15. রাজনীতি
সবখবর

শেখ হাসিনার রুদ্ধশ্বাস এক রাত!

Link Copied!

স্টাফ রিপোর্টার:
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট, শনিবার। আওয়ামী লীগের ২৩ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউর কেন্দ্রীয় অফিসের চারপাশে অসংখ্য মানুষের উপচে পড়া ভিড়। তখন বিকেল ৫টা ২২ মিনিট। হঠাৎ শক্তিশালী গ্রেনেডের বিস্ম্ফোরণ। ১৩টি গ্রেনেডের ভয়াবহতায় আকস্মিক মৃত্যুর আস্ম্ফালন। রক্তস্রোতে ভেসে গেল অসংখ্য মানুষ। চারদিকে মানবদেহের ছিন্নভিন্ন টুকরো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে।

মৃত্যুর ওই আঙিনায় দাঁড়িয়ে হতবিহ্বল সবার একটিই জিজ্ঞাসা ছিল, ‘বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা কোথায়? তিনি বেঁচে আছেন তো!’ হন্যে হয়ে কমবেশি সবাই আওয়ামী লীগ সভাপতির গাড়ির খোঁজ করতে থাকেন। খানিক পরই যেন কানে এলো ঘোষণা- ‘মহান আল্লাহর অশেষ মেহেরবানিতে সম্পূর্ণ অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে গেছেন শেখ হাসিনা। তাঁকে সুধা সদনের বাসভবনে নেওয়া হয়েছে।’

অশুভ শক্তির বিভীষিকাময় ওই শক্তিশালী গ্রেনেড হামলার আগমুহূর্তে ট্রাকমঞ্চ থেকে ভাষণ দিচ্ছিলেন আওয়ামী লীগ সভাপতি। তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কর্মকর্তা নজিব আহমেদ ছিলেন ঠিক পেছনে। তিনি সেদিনের ভয়াবহতার বর্ণনা দিয়ে বলেছেন, আওয়ামী লীগ সভাপতির সংক্ষিপ্ত ভাষণ শেষ হওয়ার পরও ফটোসাংবাদিকদের অনুরোধে আরও কিছুক্ষণ ভাষণ দিচ্ছিলেন শেখ হাসিনা। ওই সময়েই বিকট শব্দে একের পর এক বিস্ফোরিত হয় কমপক্ষে ১০টি তাজা গ্রেনেড। আর সঙ্গে সঙ্গেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শেখ হাসিনার কাছে ছুটে আসেন নজিব আহমেদ। তখন উচ্চ স্বরে কালেমা তৈয়্যবা ও দোয়া ইউনুস পড়ছিলেন শেখ হাসিনা। আর বলছিলেন, ‘সবাই আল্লাহকে ডাকেন। একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আমাদের বাঁচানোর কেউ নেই।’ ওই সময়ে মুহূর্তের মধ্যে বঙ্গবন্ধুকন্যাকে ঘিরে মানবঢাল তৈরি করেন ঢাকার প্রথম নির্বাচিত মেয়র মোহাম্মদ হানিফ, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রম, নজিব আহমেদ ও আবদুল্লাহ আল মামুন।

এ সময় ট্রাকমঞ্চের সিঁড়ির গোড়ায় গাড়ি নিয়ে আসেন মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক। তখন আরেক দফায় গ্রেনেড হামলায় স্প্লিন্টারের আঘাতে তারিক আহমেদ সিদ্দিক, নজিব আহমেদ ও আবদুল্লাহ আল মামুনের শরীর রক্তে ভিজে যায়। তাঁরা সেটা উপেক্ষা করে শেখ হাসিনাকে মঞ্চের ওপরে বসিয়ে রাখেন। একপর্যায়ে গ্রেনেড হামলা বন্ধ হলে নিচে নেমে আসেন শেখ হাসিনা। তিনি গাড়িচালক আবদুল মতিনের পাশের আসনে গিয়ে বসেন। পেছনে দুইজনের আসনে গাদাগাদি করে বসেন মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, তারিক আহমেদ সিদ্দিক, নজিব আহমেদ, আবদুল্লাহ আল মামুন ও মেজর (অব.) সোয়েব।

এরপর গাড়ি ছুটে চলে সুধা সদনের উদ্দেশে। নজিব আহমেদ জানান, বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ থেকে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম, জিপিও, শহীদ নূর হোসেন স্কয়ার, আবদুল গনি রোড, হাইকোর্ট, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, আজিমপুর, নিউমার্কেট ও পিলখানা হয়ে সুধা সদনে পৌঁছে শেখ হাসিনাকে বহন করা গাড়ি। ওই সময়ে সুধা সদনের নিচতলায় ড্রয়িংরুমে গভীর উৎকণ্ঠা নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন বঙ্গবন্ধুর ছোট কন্যা শেখ রেহানা। আওয়ামী লীগ সভাপতি সুধা সদনে পৌঁছেই মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া ও তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী জাহাঙ্গীর আলমের হাতে কিছু টাকা দিয়ে যে কোনো মূল্যে দলের আহত নেতাকর্মীদের চিকিৎসা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন।

নজিব আহমেদ জানালেন, ওই রাতের সারাটা ক্ষণ জেগেছিলেন আওয়ামী লীগ সভাপতি। রাতের খাওয়াও হয়নি তাঁর। সারাক্ষণই তিনি আহত নেতাকর্মীদের খোঁজ-খবর নিয়েছেন। তাঁদের চিকিৎসা করানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। ওই সময়ে মাঝেমধ্যেই আহত নেতাকর্মীদের মৃত্যুসংবাদ আসছিল। আর সেটা শুনে গভীর শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়ছিলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা। সারাটা রাত তিনি অস্থির হয়ে পায়চারি করছিলেন। কখনও দোতলায় গেছেন, আবার ফিরে এসেছেন নিচতলার ড্রয়িংরুমে। আওয়ামী লীগ সভাপতির মতো তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকর্মীদেরও নির্ঘুম রাত কেটেছে ওই দিন। সুধা সদনেও হামলার আশঙ্কায় তাঁদের সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকতে হয়েছে।

আওয়ামী লীগ সভাপতির ব্যক্তিগত সহকারী জাহাঙ্গীর আলম গ্রেনেড হামলার পূর্বক্ষণে শেখ হাসিনার গাড়ির সামনে অপেক্ষা করছিলেন। তিনি বললেন, ভয়ংকর গ্রেনেড হামলার টার্গেট ছিলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। জীবন বাজি রেখে তাঁকে বাঁচিয়েছেন তাঁরই প্রিয় সহকর্মী-সহমর্মীরা। শেখ হাসিনাকে আড়াল করে বুলেটের সামনে দাঁড়িয়ে জীবন বিলিয়ে দেন তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকর্মী ল্যান্স করপোরাল (অব.) মাহবুবুর রশীদ। জাহাঙ্গীর আলম জানালেন, প্রথম গ্রেনেডটি বিস্ফোরিত হয়েছিল ট্রাকমঞ্চ থেকে নামার সিঁড়িতে। ওই সময়ে ফটোসাংবাদিক এস এম গোর্কি ও মোহাম্মদ আলমের অনুরোধে আওয়ামী লীগ সভাপতি বক্তৃতারত না থাকলে তাঁর ওপরই গ্রেনেডটি বিস্ফোরিত হতো।

জাহাঙ্গীর আলম জানালেন, গ্রেনেড হামলার শব্দ শোনার পর থেকেই অনবরত দোয়া-দরুদ পড়ছিলেন আওয়ামী লীগ সভাপতি। তাঁর চোখে চশমা ছিল না। স্যান্ডেলও ছিল না। ওই সময়ে শেখ হাসিনার গাড়ি লক্ষ্য করে বৃষ্টির মতো গুলি হচ্ছিল। গাড়িও ছুটছিল সুধা সদনের উদ্দেশে। বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে শেখ হাসিনার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশের পরিত্যক্ত গাড়ি চালিয়ে শেখ হাসিনার গাড়ি অনুসরণ করেন জাহাঙ্গীর আলম। গ্রেনেড হামলার পর দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা গাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়েছিল। জাহাঙ্গীর আলম নিজেও হাতে ও পিঠে স্প্নিন্টারের আঘাতে আহত হয়েছিলেন।

আওয়ামী লীগ সভাপতি সুধা সদনে পৌঁছানোর পর কিছু সময় স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারছিলেন না বলে জানান জাহাঙ্গীর আলম। ওই সময়ে শেখ হাসিনা গম্ভীর ও চুপচাপ হয়েছিলেন। নির্ভরতার প্রতীক হয়ে তাঁর পাশে ছিলেন ছোট বোন শেখ রেহানা। তবে একপর্যায়ে নিজেকে সামলে নিয়ে শেখ হাসিনা আহতদের চিকিৎসার নির্দেশ দেন মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া ও জাহাঙ্গীর আলমকে। নেতাকর্মীদের চিকিৎসা ব্যয় নির্বাহের জন্য তাঁদের হাতে কিছু টাকা তুলে দেন শেখ রেহানা। এরপর তাঁরা ছুটে যান বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউর রণক্ষেত্রে।

জাহাঙ্গীর আলম রাত ২টা পর্যন্ত রাজধানীর প্রতিটি হাসপাতালে গিয়ে আহতদের চিকিৎসার খোঁজ নেন। ওই সময় টেলিফোনে কথা বলার মতো অবস্থায় ছিলেন না শেখ হাসিনা। তাঁর টেলিফোন রিসিভ করতেন শেখ রেহানা। হাসপাতালে নেতাকর্মীদের চিকিৎসা সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য শেখ রেহানার মাধ্যমে শেখ হাসিনার কাছে পৌঁছে দিয়েছেন জাহাঙ্গীর আলম। তিনি রাত ৩টায় সুধা সদনে গিয়ে দেখেন, শেখ হাসিনা জেগে আছেন। মাঝেমধ্যেই ছোট বোন শেখ রেহানাকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কান্নাকাটি করছেন। আর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নিয়ে আহত নেতাকর্মীদের খোঁজখবর নিচ্ছেন।

আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক বললেন, ওই দিন হায়েনার ছোবলে স্তম্ভিত হয়ে পড়ে গোটা দেশ। গ্রেনেড হামলার পর আহত নেতাকর্মীদের হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করে তিনি আওয়ামী যুবলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক মির্জা আজমকে সঙ্গে নিয়ে সুধা সদনে যান। তখন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা। শেখ হাসিনা নির্বাক হয়ে ড্রয়িংরুমে বসে আছেন। তাঁর চেয়ারের হাতলে বসে তাঁর গলা জড়িয়ে আছেন বঙ্গবন্ধুর ছোট কন্যা শেখ রেহানা। তাঁরা দুজনই বিমর্ষ, হতবাক, স্তম্ভিত।

জাহাঙ্গীর কবির নানক জানান, ওই সময়ে মির্জা আজমকে দেখতে না পেয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতির ধারণা জন্মে, মির্জা আজম গ্রেনেড হামলায় নিহত হয়েছেন। তখন তিনি ভীষণ উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জানতে চান, ‘আজম কোথায়?’ তাঁকে জানানো হলো, মির্জা আজম ওয়াশরুমে। মির্জা আজম আসার পর অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক গ্রেনেড হামলায় হতাহতের প্রতিবাদ এবং বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত হরতাল ডাকার অনুরোধ জানালেন। কিন্তু সেই অনুরোধে সাড়া দেননি আওয়ামী লীগ সভাপতি।

তিনি তাঁদের বললেন, ‘যাও। যাঁরা মারা গেছেন, তাঁদের দাফন-কাফনের ব্যবস্থা করো। আহত নেতাকর্মীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করো। মানুষ বাঁচাও। প্রয়োজনে আমাদের দুই বোনের যা কিছু আছে, তা নিয়ে গিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন নেতাকর্মীদের চিকিৎসা করাও।’ ওই সময় অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, ‘আমার জন্য আর কত মানুষ মারা যাবে? আমারই মরে যাওয়া ভালো। আল্লাহ কেন আমাকে তুলে নেন না?’

অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক ও মির্জা আজম রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত সুধা সদনে ছিলেন। নানক জানান, ওই সময় তাঁরা শেখ হাসিনাকে দোতলায় গিয়ে বিশ্রাম নেওয়ার অনুরোধ জানালেও তিনি সাড়া দেননি। সারাক্ষণ আহত নেতাকর্মীদের খোঁজ নিয়েছেন। নিহত নেতাকর্মীদের দাফন-কাফনের ব্যবস্থা করছিলেন। তখন সুধা সদনে অবস্থান করছিলেন আওয়ামী লীগ সভাপতির ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও কর্মীরা।

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম ঘটনাস্থলের বর্ণনা দিয়ে বলেছেন, আহতদের হাসপাতালে নেওয়ার মতো অবস্থাও ছিল না। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে অনেকে ঘটনাস্থলেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। মানুষ যখন প্রাণভয়ে দিজ্ঞ্বিদিক ছোটাছুটি করছে, তখন উল্টো কর্তব্যরত পুলিশ বাহিনী বেধড়ক লাঠিচার্জ ও অবিরাম টিয়ার গ্যাসের শেল ছুড়েছে।

মির্জা আজম জানালেন, সুধা সদনে তাঁরা একপর্যায়ে অবিরাম হরতাল কর্মসূচির কথা বললেও শেখ হাসিনা সবার আগে আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছেন। তিনি তাঁদের বলেছেন, ‘শুনেছি- বিএনপি সমর্থক চিকিৎসকরা চিকিৎসা না দিয়ে হাসপাতাল থেকে চলে গেছেন। সুতরাং তোমরা চিকিৎসক খোঁজ করো। আহতদের প্রয়োজনে বিদেশে পাঠিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করো। সবার আগে মানুষ বাঁচাও।’

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে : 1K বার